প্রযুক্তির যেসব পণ্য-সেবায় দাম বাড়তে-কমতে পারে
অভ্যন্তরীন ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ ও রাজস্ব খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে বৃহস্পতিবার (৬ জুন) অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উপস্থাপন করবেন। সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকার’ স্লোগানকে সামনে রেখে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকার এ বাজেট ঘোষণা হতে পারে।
নতুন বাজেট ঘিরে শুল্ক খাত নিয়ে যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে দেশীয় শিল্প ও দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যকে সুরক্ষা প্রদানের চেষ্টা আছে। শুল্ক হার হ্রাস-বৃদ্ধির কারণে প্রযুক্তি খাতের অনেক পণ্য ও সেবার দামে প্রভাব পড়তে পারে। এয়ারকন্ডিশনার, ওয়াটার পিউরিফায়ার (পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র), মোটরসাইকেল, এটিএম, সিসি ক্যামেরা, জেনারেটর, এলইডি লাইটের শুল্কহার বাড়ানোর প্রস্তাব থাকতে পারে বাজেটে। অন্যদিকে ল্যাপটপ, কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার, কৃত্রিম আঁশের কার্পেট, দেশে সংযোজিত বা থৈরি ইলেকট্রিক মোটর, মোটরসাইকেল, চিলারসহ বেশ কিছু পণ্যের শুল্ক কমানোর প্রস্তাব থাকতে পারে। এছাড়াও বাড়ছে আমদানীকৃত মোবাইল ও মোবাইলে কথা বলা এবং ইন্টরনেট ব্যবহারের খরচ। তবে দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল ক্রয়ে সুবিধা পাবেন ক্রেতারা।
যেসব পণ্য-সেবায় দাম বাড়তে-কমতে পারে
কর্মোপযোগী শিক্ষা ও যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা; আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা; লাভজনক কৃষির লক্ষ্যে সমন্বিত কৃষিব্যবস্থা, যান্ত্রিকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো ইশতেহারের ১১টি বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেটে। এতে আগামী তিন বছরের জন্য ১৩টি উপখাতে নিবাসী ব্যক্তি বা অনিবাসী বাংলাদেশীর ব্যক্তির ব্যাবসায় করমুক্ত সুবিধার প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। ফলে এআই ও ব্লকচেইন ভিত্তিক সেবা উন্নয়ন, রোবটিক প্রসেস আউটসোর্সিং, ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ নির্ভর ব্যবসায়, মোবাইল অ্যাপ উন্নয়ন, সফটওয়্যার সেবা, সফটওয়্যার উন্নয়ন ও বিশেষিয়তকরণ, সাইবার নিরাপত্তা সেবা, ল্যাবে সফটওয়্যার পরীক্ষা সেবা, ওয়েবলিস্টিং, ওয়েবসাইট উন্নয়ণ ও সেবা, আইটি সহায়তা ও সফটওয়্যার সারাই ও দেখভাল করা, ভৌগলিক তথ্য সেবা (জিআইএস), ডিজিটাল এনিমেশন, ডিজিটাল গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল ডেটা এন্ট্রি ও প্রসেসিং, ইলার্নিং প্লাটফর্ম ও ই-প্রকাশনা এবং আইটি ফ্রিল্যান্সিং, কলসেন্টার সেবা ও ডক্যুমেন্ট কনভার্সন, ইমেজিং, ডিজিটাল আর্কাইভিং এর মতো কাজে কর অব্যাহতি সুবিধা পাবেন ব্যবসায়ীরা। ফলে এসব সেবা মূল্যের দাম আসছে বাজেটে বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
- বাজেটে সব কার্যক্রম ক্যাশলেস বা নগদ অর্থের বিনিময় ছাড়া সম্পন্ন করতে পারলে আইসিটির সঙ্গে জড়িত ১৩টি খাতকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য করছাড় দেওয়ার ঘোষণা থাকছে।
দেশীয় শিল্পের বিকাশে ২০২৩-২৪ বাজেটে ল্যাপটপ-কম্পিউটার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়। ফলে আমদানিকারকদের বর্তমানে ল্যাপটপ আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্কসহ বর্তমানে ল্যাপটপে আমদানি মোট ৩১ শতাংশ শুল্ককর দিতে হয়। তবে নতুন ২০২৪-২৫ বাজেটে এ পণ্যটিতে শুল্ককর ১০ শতাংশ কমিয়ে ২০ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। মোবাইলের কাঁচামাল আমদানির শুল্ক সুবিধা আরও ২ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্তে আসছে অর্থ বছরে ল্যাপটপ, কম্পিউটারের দাম কমতে পারে।
- এয়ারকন্ডিশনার তৈরিতে ব্যবহৃত স্টিল শিটের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে।
- ওয়াটার পিউরিফায়ার বা পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র আমদানির শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হতে পারে।
- দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের কাঁচামালের শুল্ক রেয়াতের মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা। এটি ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা থাকবে নতুন বাজেটে।
- এ ছাড়া ২৫০ সিসির বেশি ইঞ্জিনের মোটরসাইকেলের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকবে।
- অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ও থিমপার্কে প্রবেশে এবং রাইডে চড়তে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপিত আছে। এটি বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হতে পারে। এতে রাইডে চড়ার খরচ বাড়তে পারে।
জানা গেছে, দেশে তৈরি মোটরসাইকেলের সিকেডি ইঞ্জিনের পার্টস আমদানির শুল্ক কমানো হচ্ছে। এ কারণে দেশে তৈরি মোটরসাইকেলের দাম কমতে পারে। এ ছাড়াও কমতে পারে ল্যাপটপ, কম্পিউটারের দাম। একইভাবে এয়ারক্রাফটের ইঞ্জিন ও প্রপেলার আমদানি পর্যায়ে কমতে পারে মূসক। ফলে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণে কমতে পারে খরচ।
- প্রস্তাবিত বাজেটে এটিএম ও সিসি ক্যামেরার আমদানি শুল্ক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে।
- এ ছাড়া জেনারেটরের সংযোজনী পণ্য, এলইডি ও এনার্জি সেভিং ল্যাম্পে ১ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব থাকতে।
- বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত সুইচ-সকেটের দাম কমতে পারে। কারণ দেশে উৎপাদিত সুইচ-সকেট, হোল্ডার উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের আমদানি শুল্ক কমানো হচ্ছে। ইলেকট্রিক মোটর উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে ইলেকট্রিক মোটরের দাম কমতে পারে।
- অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং হাই-টেক পার্কের বিনিয়োগকারীরা তাদের বর্তমান শুল্কমুক্ত সুবিধা হারিয়ে প্রায় সমস্ত ক্যাটাগরির মূলধনি যন্ত্রপাতির ওপর ১ শতাংশ আমদানি শুল্কের মুখোমুখি হতে পারেন।
- ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট আদায় বাড়াতে সিকিউরিটিজ সার্ভিস সেবার বিপরীতে ভ্যাটের হার ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হতে পারে। এতে বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের সিকিউরিটি সার্ভিসেও আগামী অর্থবছর বাড়তি টাকা খরচ করতে হবে।
বাজেটে খরচ বাড়বে মোবাইল ফোনে কথা ও ইন্টারনেট ব্যবহারে। দাম বাড়তে পারে বিলাসবহুল গাড়িরও। মোবাইল অপারেটরদের সিমকার্ড বিক্রির ওপর কর ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা হতে পারে। ফলে বাড়তি দামে সিমকার্ড বিক্রি হতে পারে। বাড়বে এসি ও ফ্রিজের দাম। আগামী বাজেটে এসিকে বিলাসী পণ্য বিবেচনা করে দেশে এসি উৎপাদনে ব্যবহৃত কম্প্রেসার ও সবধরনের উপকরণের শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে। বেশকয়েক বছর ধরে দেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্য খাতকে সরকার ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে আসছে। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত ফ্রিজ উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে। তা আর বৃদ্ধি করা হচ্ছে না। ফলে নতুন অর্থবছরে পাঁচ শতাংশ ভ্যাটের হার বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশ করা হতে পারে। এ কারণে ফ্রিজের দামও বাড়তে পারে।
এছাড়া, বিলাসবহুল গাড়ির দামও বাড়তে পারে। বর্তমানে সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আমদানি করতে পারেন। তবে বাজেটে এই সুবিধা বাতিল হচ্ছে। গাড়ি আমদানি করতে হলে সংসদ সদস্যদের ২৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে, বাজেটে এমন প্রস্তাব থাকতে পারে। আর বিলাসবহুল গাড়িতে শুল্ক ফাঁকি রোধে হাইব্রিড ও নন হাইব্রিড টাইপের গাড়ি ছাড় করতে কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত যোগ করা হচ্ছে। রাজস্ব আদায়ের আওতা বৃদ্ধি করলে মোবাইলে কথা বলতে আরও বাড়তি অর্থ গুনতে হবে ভোক্তাকে। বর্তমানে একজন ভোক্তা মোবাইলে ১০০ টাকা রিচার্জ করলে ৭৩ টাকার কথা বলতে পারেন। বাকি ২৭ টাকা ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক হিসেবে কেটে নেয় মোবাইল অপারেটরগুলো। প্রস্তাবিত বাজেটে মোবাইল সেবার ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হলে ভোক্তা ৬৯ দশমিক ৩৫ টাকার কথা বলতে পারবেন। পাশাপাশি হাইটেক পার্কের জন্য আমদানি করা যেসব গাড়ি আগে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত, সেসব গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে। ফলে এখানে হাইটেক পার্কে বিনিয়োগকারীদের খরচ বাড়বে।
একইভাবে ক্যাশলেস লেনদেন ব্যবস্থা অবলম্বন না করলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে আগামী অর্থবছরে অতিরিক্ত আড়াই শতাংশ করপোরেট কর দিতে হতে পারে। জানা যায়, সরকার ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এ হার বাড়িয়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা করছে। তাছাড়া ১০ শতাংশ পর্যন্ত ফ্রি ফ্লোটসহ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর করপোরেট করের হার বর্তমান সাড়ে ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৫ শতাংশ হতে পারে।







